বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও ঘনবসতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় প্রতিবছরই বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ধস, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন ও তীব্র শীতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। এসব দুর্যোগ কখনো কখনো ভয়াবহ আকার ধারণ করে বিপর্যস্ত করে তোলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
দুর্যোগের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, শিশু, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবে গেলে অনেক পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। ফসল নষ্ট হয়ে কৃষকের পুরো বছরের আয় অনিশ্চিত হয়ে যায়। শীতের সময় উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েন। কোথাও আবার পাহাড়ধস কিংবা অতিবৃষ্টিতে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে দেখা দেয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের সংকট।
এমন সংকটময় সময়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, মানবিকতারও বড় দৃষ্টান্ত। সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ, খাদ্য, পোশাক, ওষুধ কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করা যায়। পাশাপাশি স্বেচ্ছাশ্রম, উদ্ধারকাজ, রক্তদান, তথ্য প্রচার ও সময় দেওয়ার মাধ্যমেও মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসব মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করে তুলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই একটি দুর্যোগের খবর দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। কোথায় মানুষ আটকা পড়েছে, কোথায় খাবার বা বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন কিংবা কোথায় আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে—এসব তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ত্রাণ সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন দুর্গত মানুষের প্রয়োজন তুলে ধরে সাহায্যের আহ্বান জানালে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাতে সাড়া দিতে পারেন। এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি জানতে পেরে অর্থসহায়তা ও ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারেন।
শুধু দুর্যোগ নয়, জরুরি রক্তের প্রয়োজন, চিকিৎসা সহায়তা, আর্থিক সহযোগিতা কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পেতেও সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দ্রুত অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেক সময় সেই পোস্টের মাধ্যমেই পাওয়া যায় কাঙ্ক্ষিত রক্তদাতা।
করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও অনলাইনে মানুষের সহযোগিতার শক্তি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। অক্সিজেন, হাসপাতালের শয্যা, ওষুধ ও চিকিৎসকের পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেক মানুষ অপরিচিতদের জন্যও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তবে সোশ্যাল মিডিয়ার এই ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি সতর্কতাও জরুরি। দুর্যোগের সময় গুজব, পুরোনো ছবি, মিথ্যা তথ্য কিংবা ভুয়া ত্রাণ সংগ্রহের আবেদন ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে প্রকৃত সাহায্যপ্রার্থীরা বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে এর সত্যতা যাচাই করা এবং ত্রাণ সহায়তার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা সংগঠনের পরিচয় ও অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, দুর্যোগ কিংবা যেকোনো মানবিক সংকটে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। সঠিক তথ্য, দায়িত্বশীল প্রচার ও মানবিক উদ্যোগের সমন্বয় ঘটলে একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টও হয়ে উঠতে পারে বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তার শক্তিশালী হাতিয়ার।
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: