ইরান-কে ঘিরে চলমান সংঘাত চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশের পথে, আর এমন সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মেয়াদের অন্যতম কঠিন সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তেহরানের মাটিতে সরাসরি মার্কিন স্থলসেনা নামানো হবে কি না, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসে চলছে নিবিড় আলোচনা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই বৈঠক করছেন ট্রাম্প। এসব বৈঠকে তাকে একাধিক বিকল্প দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে স্থল অভিযানের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এখনো তিনি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প কৌশলী অবস্থান বজায় রেখে বলেন, তিনি এখনই কোথাও সৈন্য পাঠাচ্ছেন না, আর পাঠালেও তা আগেভাগে জানাবেন না। তার এই মন্তব্যে পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর গতিবিধি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে রণতরী USS Abraham Lincoln-এর সক্রিয়তা এবং মেরিন ইউনিটগুলোর অবস্থান সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, এই সম্ভাব্য স্থল অভিযানকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকানদের মধ্যেই বিভক্তি তৈরি হয়েছে। অনেক প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইরানে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনা পাঠানো হলে তারা এই যুদ্ধের সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারেন। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিপুল ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দলটির ভেতরেই।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইরানের হুমকি—কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা। এই জলপথ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, এই পথ পুনরায় সচল করতে কেবল আকাশ বা নৌ অভিযান যথেষ্ট নাও হতে পারে, ফলে স্থল অভিযানের সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে ইসরায়েল-এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পার্থক্যও সামনে আসছে। ইসরায়েল চায় ইরানের বর্তমান শাসনের পতনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান, আর ট্রাম্প চান দ্রুত সামরিক সাফল্য দেখিয়ে যুদ্ধ শেষ করতে। ফলে দুই দেশের লক্ষ্য নিয়ে ভিন্নতা তৈরি হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের প্রশ্নেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। মার্কিন পক্ষ দাবি করছে বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে, তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বলছেন, শুধু হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক জ্ঞান বা সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো নিষ্ক্রিয় করতে গেলে বড় ধরনের ঝুঁকি, এমনকি তেজস্ক্রিয় দূষণের আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়েছেন ট্রাম্প। একদিকে যুদ্ধের গতি নির্ধারণ, অন্যদিকে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—দুই দিক সামলাতে গিয়ে তাকে নিতে হচ্ছে অত্যন্ত সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের দিকে আরও মার্কিন রণতরী ও সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের এক মাস পূর্তিকে ঘিরেই বড় কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে, যা এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: