ব্রিটেনের ব্র্যাডফোর্ড শহরে ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ের প্রথা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চিকিৎসক ও গবেষকদের একাংশ বলছেন, এ ধরনের বিয়ের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী ধীরে ধীরে এই প্রথা থেকে সরে আসছেন।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পরিবারগুলোর মধ্যে ফার্স্ট কাজিনকে বিয়ে করার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
ব্র্যাডফোর্ডের তিন বোন আয়েশা, মালিকা ও সালিনার পরিবারেও ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ের প্রথা ছিল। বড় বোন আয়েশা ২০১৭ সালে তার ফার্স্ট কাজিনকে বিয়ে করেন। তবে ছোট বোন সালিনা নিজের পছন্দে পরিবারের বাইরের একজনকে বিয়ে করেছেন। আর মেঝো বোন মালিকাও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি পরিবারের ভেতরে বিয়ে করবেন না।
তাদের মতে, শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ শীর্ষক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ে হওয়া পরিবারগুলোর শিশুদের মধ্যে কিছু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ১৩ হাজারের বেশি শিশুর ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। এতে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের বাবা-মা ছিলেন ফার্স্ট কাজিন।
গবেষণায় দেখা যায়—
ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানদের ভাষাগত সমস্যা দেখা দেওয়ার হার তুলনামূলক বেশি।
তাদের চিকিৎসাসেবা নেওয়ার প্রয়োজনও অন্য শিশুদের তুলনায় বেশি।
‘উন্নয়নের ভালো পর্যায়ে’ পৌঁছানোর হারও তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, বাবা-মা রক্তসম্পর্কিত হলে সন্তানদের মধ্যে বংশগত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা সিকল সেল ডিজিজের মতো রোগের আশঙ্কা বাড়ে।
ইউরোপে বাড়ছে আইনগত বিতর্ক
ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে ইউরোপজুড়ে বিতর্ক বাড়ছে। ইতোমধ্যে নরওয়ে এ ধরনের বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে। সুইডেনেও আগামী বছর থেকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যেও কনজারভেটিভ পার্টির এমপি রিচার্ড হোল্ডেন ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বর্তমান লেবার সরকার জানিয়েছে, এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ‘জেনেটিক কাউন্সেলিং’-এর মাধ্যমে দম্পতিদের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
ব্র্যাডফোর্ড টিচিং হসপিটালসের গবেষক অধ্যাপক স্যাম অডির মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু ফার্স্ট কাজিনদের বিয়ে নয়, বরং একই গোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিয়ে হওয়ার প্রবণতা বা ‘এন্ডোগামি’ও বড় ভূমিকা রাখে।
তার মতে, সচেতনতা ও শিক্ষাই এই সমস্যার সমাধানে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
ধীরে ধীরে কমছে এ ধরনের বিয়ে
‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের শেষ দিকে নতুন মায়েদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ তাদের ফার্স্ট কাজিনকে বিয়ে করেছিলেন। ২০১০ সালের শেষ দিকে সেই হার কমে দাঁড়ায় ২৭ শতাংশে।
গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণেই এই পরিবর্তন ঘটছে।
তবে এখনো অনেক পরিবারে এই প্রথা চালু রয়েছে। আয়েশার মতো কেউ কেউ মনে করেন, সম্পর্ক টিকে থাকা বা সমস্যার মুখোমুখি হওয়া শুধু ফার্স্ট কাজিনদের বিয়ের ওপর নির্ভর করে না।
তিনি বলেন, “প্রেমের বিয়েতেও সমস্যা থাকে, শুধু সমস্যার ধরন আলাদা হয়।”
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: