[email protected] রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১১:০৩

ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বৃহত্তর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত ভেঙে পড়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন আর ওই সমঝোতার শর্ত মেনে চলবে না। শনিবার একই ধরনের অবস্থান জানিয়ে ইরানও এমওইউর আওতায় নিজেদের প্রতিশ্রুতি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আরও দু-তিন দিন একইভাবে হামলা চালালে তারা ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করবে।

রয়টার্স, আলজাজিরা ও এএফপির খবরে বলা হয়েছে, শনিবার টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানের সামরিক স্থাপনা, নজরদারি ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়।

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। এতে সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল। পরবর্তীতে ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তার পরপরই আবার হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়।

ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালাচ্ছে। নতুন করে সংঘাত শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০-র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা আরও জোরদার করা হবে। এরপর থেকেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই। একইসঙ্গে তার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকলে ইরান সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করবে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলায় ইরানের সামরিক রসদ, নজরদারি ব্যবস্থা, নৌবাহিনীর অবকাঠামো এবং ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমোজগান প্রদেশে মার্কিন হামলায় তিনজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। এছাড়া দুটি সেতু, একটি সড়ক সুড়ঙ্গ এবং ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পাল্টা জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে তারা। কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি উৎপাদন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় তিন মাস পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরবেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী রিয়াদের কাছে আল-খারজের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং ইয়ানবু এলাকায় সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। যদিও এ বিষয়ে সৌদি আরব বা ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১০ দিনে দেশটির ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরও বিস্তৃত যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি বলেছেন, সংঘাতের পরিধি ও তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

আলোকিত গৌড়/আ

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর