[email protected] মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

হারিয়ে যাওয়া জীবনের খোঁজে ছুটিতে গ্ৰামে ফিরছে মানুষ!

জাহিদুর রহমান

প্রকাশিত: ২৫ মে ২০২৬, ০৬:১২

ছবি-আলোকিত গৌড়

ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর ব্যস্ত রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করেছে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন আর লঞ্চঘাটে মানুষের ভিড়।

কারও হাতে ব্যাগ, কারও কোলে শিশু, কারও চোখে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি। সামনেই ঈদুল আজহা। আর এই ছুটিকে ঘিরেই যেন শুরু হয়েছে ঘরে ফেরার এক তীব্র প্রতিযোগিতা। শুধু গ্রামের বাড়িতে নয়, মানুষের নিজের পুরোনো দিনগুলোর কাছেও ফিরে যেতে চাইছে সবাই।

বছরের অন্য সময়ে শহরের জীবন মানুষকে যান্ত্রিক করে তোলে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, যানজট, সময়ের পেছনে ছোটা, সব মিলিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের সহজ মানুষটাকে হারাতে থাকে। কিন্তু ঈদের ছুটি এলেই চিত্র বদলে যায়।

প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেক কিছু ভুলে থাকি, যেমন- শৈশবের বিকেল, গ্রামের বাড়ি, পুরোনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা, পরিবারের সঙ্গে নির্ভার সময় কাটানো। কিন্তু ছুটি এলে সেই চাপ কমে যায়, আর মন স্বাভাবিকভাবেই পুরোনো সুখের মুহূর্তগুলো খুঁজতে শুরু করে।

অনেক সময় ছুটিতে আমরা সেই একই কাজ করি, যেগুলো ছোটবেলায় করতাম। দীর্ঘ ঘুম, গল্পের বই পড়া, বৃষ্টিতে ভেজা, আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া কিংবা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা। পরিচিত গন্ধ, খাবার, গান বা কোনো জায়গা হঠাৎ করে বহু আগের অনুভূতি ফিরিয়ে আনে। তখন মনে হয় যেন সময় একটু পিছিয়ে গেছে।

ছুটি শুধু বিশ্রাম দেয় না, এটি আমাদের ভেতরের সেই মানুষটাকেও জাগিয়ে তোলে, যে একসময় অনেক সহজে আনন্দ পেত। তাই ছুটি অনেকের কাছে শুধু অবসর নয়, বরং নিজের পুরোনো দিনগুলোর সঙ্গে আবার একটু দেখা হওয়ার সুযোগ।

অনেকের কাছে এই যাত্রা শুরু হয় বাসের জানালার পাশের সিট থেকে। পরিচিত মহাসড়ক, সবুজ মাঠ, কাঁচা রাস্তা কিংবা নদীর ঘাট- এসব দৃশ্য হঠাৎ করে শৈশবের বহু স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার ঈদ, নতুন কাপড়ের গন্ধ, সকালের নামাজ শেষে সালামি নেওয়া, কিংবা উঠানে গরু নিয়ে ব্যস্ত সময়গুলো।

ঈদের ছুটির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত “একসাথে হওয়া”। সারা বছর যারা ভিন্ন শহরে, ভিন্ন ব্যস্ততায় ছড়িয়ে থাকে, এই কয়েক দিনে তারা আবার একই টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া করে, রাত জেগে গল্প করে, পুরোনো স্মৃতি নিয়ে হাসে। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্যও এই সময়টি বিশেষ-কারণ তারা অপেক্ষা করেন সন্তানদের ঘরে ফেরার জন্য।

গ্রামে পৌঁছানোর পর সময় যেন একটু ধীর হয়ে যায়। স্নিগ্ধ সকাল, মসজিদের মাইকে তাকবির, রান্নাঘরের ব্যস্ততা, উঠানে মানুষের আনাগোনা-এসব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক পরিবেশ, যা শহরের জীবনে অনেকটাই অনুপস্থিত। মানুষ তখন বুঝতে পারে, সুখের বড় অংশ আসলে খুব সাধারণ কিছু মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে।

তবে এই ফেরার গল্পের ভেতরে এক ধরনের বিষণ্নতাও থাকে। কারণ ছুটি শেষ হলেই মানুষকে আবার শহরে ফিরতে হবে-ব্যস্ততার জীবনে, সময়ের চাপে। তবু মানুষ প্রতি বছর এই অপেক্ষা করে। কারণ কয়েক দিনের জন্য হলেও এই ছুটি তাকে মনে করিয়ে দেয়, সে কোথা থেকে এসেছে, তার শেকড় কোথায়, আর কোন জীবনটা একসময় তাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছিল।

আলোকিত গৌড়/জে.আর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর