জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার সময় পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা ও ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পরে স্পিকারের বারবার হস্তক্ষেপ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, চিফ হুইপ ও সিনিয়র সংসদ সদস্যদের দফায় দফায় বক্তব্যের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। একপর্যায়ে স্পিকার বিতর্কিত অংশ পরীক্ষা করে দেখার আশ্বাস দেন।
বুধবার (২৪ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা করেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করে বলেন, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী এবং অন্যায় কৌশল অবলম্বনকারীদের পরিণতি শুভ হয় না। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অস্বীকার করে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন অভিযোগ করেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ঠাট্টা-বিদ্রুপের শামিল এবং অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, কোরআনের আয়াত এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সরকারি দলের প্রশংসা করলে পুরস্কার মিলবে আর না করলে শাস্তি দেওয়া হবে—এ ধরনের ব্যাখ্যা পবিত্র কোরআনের ভুল ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন।
নাজিবুর রহমান মোমেন আরও বলেন, কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা বা অবমাননা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি স্পিকারের দৃষ্টিতে এনে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
জবাবে স্পিকার বলেন, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ একজন পুরোনো সংসদ সদস্য এবং তিনি কোরআন-হাদিস নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করতে পারেন বলে মনে হয় না। তবে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হবে এবং যদি কোনো ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ বা বাদ দেওয়া হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ এবং এখানে কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা কখনই গ্রহণযোগ্য হবে না।
পরে এ বিষয়ে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ একজন মাওলানা ও মাদরাসার ছাত্র। তিনি সৎ উদ্দেশ্যেই আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা করা বা এটি নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলা ঠিক হয়নি। দেশের কোনো সংসদ সদস্য ভুলক্রমেও ইসলামের অবমাননা করলে সরকার তার নিন্দা করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন বিরোধীদলের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আয়াতের নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট আড়াল করে বিষয়টিকে দলীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার ভাষ্য, বাজেটের প্রশংসা না করলে বিরোধীদলের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে—এমন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে আলেম বা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করার দাবি জানান তিনি।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্পিকার সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ট্রেজারি বেঞ্চেও মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম রয়েছেন। নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি না করার শর্তে সরকারিদলীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামানকে কথা বলার সুযোগ দেন তিনি।
কামরুজ্জামান বলেন, পবিত্র কোরআনের শিক্ষার মূল কথা হলো শোনা ও তা পালন করা। আলেম-ওলামাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি আহ্বান জানান, সবাই যেন সহিহ ও সঠিক বিষয়গুলোর ওপর আমল করেন।
সবশেষে বিতর্কের অবসান ঘটাতে বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, সংসদের সিনিয়র নেতারা কথা বললে অন্য সদস্যদের স্বাভাবিকভাবেই আসনে বসে শোনা উচিত। তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী। অভিযুক্ত সদস্য মাহফুজুল্লাহ সাহেব নিজেও একজন আলেম। ফলে তিনি কোনো ব্যঙ্গাত্মক বা পরিহাসের উদ্দেশ্যে এ কথা বলেননি; বরং সবার আমলকে আরও সহিহ ও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেই তিনি বক্তব্য দিয়েছেন।
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: