রোজা বা সাওম মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই আত্মসংযম, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতির এক গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অনুশাসন হিসেবে প্রচলিত। এটি শুধু ইসলামী শরিয়তের বিধান নয়; বরং পূর্ববর্তী নবী-রাসুল ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও রোজার চর্চা ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
ইমাম সুয়ুতি (র.) তাঁর গ্রন্থ ‘আল-ওয়াসাইল ইলা মারিফাতিল আওয়াইল’-এ উল্লেখ করেন, মানবজাতির প্রথম রোজাদার ছিলেন আদম (আ.)। তিনি প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখতেন এবং আল্লাহর কাছে তাঁর তাওবা কবুল হওয়ার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রথম রোজা পালন করেন। অন্য একটি বর্ণনায় নুহ (আ.)-কে প্রথম রোজাদার বলা হয়েছে। মহাপ্লাবনের পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তিনি রোজা রেখেছিলেন এবং পরবর্তী সময়েও নিয়মিত রোজা পালন করতেন।
ইতিহাসে রোজার আরেকটি রূপ ছিল ‘নীরব থাকার রোজা’। পবিত্র কোরআনের কোরআন-এর সুরা মরিয়ম-এ উল্লেখ রয়েছে, আল্লাহর নির্দেশে মরিয়ম (আ.) নীরব থাকার মানত করেছিলেন।
পবিত্র কোরআন-এর সুরা বাকারা-র ১৮৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী জাতিদের ওপরও রোজা ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তারা তাকওয়া অর্জন করতে পারে। ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থেও রোজার উল্লেখ রয়েছে। তাওরাত অনুযায়ী, মুসা (আ.) ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। ইঞ্জিলে বর্ণিত আছে, ঈসা (আ.)-ও ৪০ দিন রোজা পালন করেছিলেন এবং তাঁর অনুসারীরাও রোজা রাখতেন।
দাউদ (আ.)-এর রোজা সম্পর্কে সহিহ সহিহ বুখারি-তে উল্লেখ রয়েছে—তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন বিরতি দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ রোজাকে উত্তম নফল রোজা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইসলামের আবির্ভাবের পর দ্বিতীয় হিজরিতে (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়। কোরআন-এর সুরা বাকারা-র ১৮৫ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়, রমজান সেই মাস যাতে কোরআন নাজিল হয়েছে—মানবজাতির হিদায়াতের জন্য।
রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে নবী মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা আশুরার দিন এবং প্রতি মাসে তিন দিন করে রোজা রাখতেন। পরবর্তীতে রমজানের ফরজ রোজার মাধ্যমে এই ইবাদত পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে।
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, রোজা কেবল খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইসলামে রোজা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার একান্ত ইবাদত হিসেবে বিবেচিত, যার প্রতিদান আল্লাহ নিজেই প্রদান করবেন বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
এভাবেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় রোজা মানবজাতির আধ্যাত্মিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে এবং ইসলামে তা একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: