ইসলাম মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করতে নানা ইবাদতের ব্যবস্থা করেছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইতিকাফ।
ইতিকাফ মানে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদত, স্মরণ ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা। মাহে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া হিসেবে বিবেচিত।
‘ইতিকাফ’ শব্দটি আরবি, যার অর্থ আবদ্ধ থাকা, অবস্থান করা বা নিজেকে নিবিষ্ট রাখা। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট নিয়তে আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়। এই ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা, আত্মশুদ্ধি অর্জন করা এবং গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। ইতিকাফ মানুষকে শেখায় কিভাবে দুনিয়ার অস্থায়ী মোহ থেকে দূরে সরে আখিরাতমুখী জীবন গড়ে তুলতে হয়। এটি এক ধরনের আত্মিক প্রশিক্ষণ, যেখানে বান্দা নিজের নফসকে সংযত করে ইবাদতে মনোনিবেশ করে।
পবিত্র Qur'an-এ ইতিকাফের উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সহবাস কোরো না।’ (Surah Al-Baqarah, আয়াত: ১৮৭)। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে নির্দেশ দিয়েছিলাম—তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত: ১২৫)। এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইতিকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা প্রাচীন নবীদের যুগ থেকেও প্রচলিত।
হাদিসেও ইতিকাফের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী Muhammad (সা.) নিয়মিত রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। হাদিসে এসেছে—‘নবী করিম (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁকে ইন্তেকাল দেন।’ (Sahih al-Bukhari, Sahih Muslim)। অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক দিন ইতিকাফ করে, আল্লাহ তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করেন।
রমজানের শেষ দশকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো Laylat al-Qadr, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। ইতিকাফকারী ব্যক্তি পুরো শেষ দশক মসজিদে অবস্থান করার মাধ্যমে এই মহিমান্বিত রাত লাভের সর্বোত্তম সুযোগ পায়। কারণ সে সময় নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ায় অধিক সময় ব্যয় করা সম্ভব হয় এবং আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভের সুযোগ তৈরি হয়।
ইতিকাফ মানুষের আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দুনিয়ার ব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগ ও পারিবারিক কাজকর্ম থেকে দূরে থাকার ফলে মানুষ নিজের অন্তরের দিকে মনোযোগ দিতে পারে। সে নিজের গুনাহ, ভুল ও ত্রুটিগুলো উপলব্ধি করে আল্লাহর কাছে তাওবা করার সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ধৈর্য, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণ তৈরি হয় এবং অহেতুক কথা ও সময় অপচয় থেকে নিজেকে বিরত রাখার প্রশিক্ষণ লাভ করে।
ইতিকাফ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এর সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে। মসজিদকেন্দ্রিক জীবন মানুষকে দ্বিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে এবং দ্বিনি আলোচনা, নসিহত ও কোরআন-হাদিস চর্চার পরিবেশ তৈরি করে। এর মাধ্যমে সমাজে তাকওয়াবান মানুষ তৈরি হয়, যারা পরবর্তী সময়ে পরিবার ও সমাজে নৈতিকতা ও দ্বিনি মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়।
ধর্মীয় আলেমরা বলেন, ইতিকাফ হলো আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। এটি বান্দাকে দুনিয়ার কোলাহল থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দরবারে একান্তভাবে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য এনে দেয়। তাই মুসলমানদের উচিত এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতকে গুরুত্ব দিয়ে জীবনে বাস্তবায়ন করা।
লেখক: জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুরের মুহতামিম।
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: