[email protected] রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

সদকাতুল ফিতর: গুরুত্ব, আদায়ের নিয়ম ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৯

ফাইল ছবি

ইসলামে সদকাতুল ফিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। পবিত্র রমজান মাসে সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতরের আনন্দ যাতে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায়রা সমানভাবে উপভোগ করতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই এই সদকা ওয়াজিব করা হয়েছে। এটি শুধু দরিদ্রদের সহায়তা নয়, বরং রোজাদারের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার একটি মাধ্যম এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপায়।

বর্তমানে অনেক প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করে নিজ দেশে ফিতরা আদায় করতে চান। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যিনি ফিতরা দেবেন তিনি যেখানে অবস্থান করছেন, সেখানকার দ্রব্যমূল্য অনুযায়ী ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ কেউ যদি সৌদি আরবে অবস্থান করেন এবং বাংলাদেশে ফিতরা পাঠাতে চান, তাহলে তাকে সৌদি আরবের সর্বনিম্ন ফিতরার হার অনুযায়ী অর্থ পাঠাতে হবে। বাংলাদেশের কম হার অনুযায়ী দিলে ফিতরা আদায় হবে না। তবে প্রবাসীর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা যদি দেশে অবস্থান করেন, তাহলে তাদের ফিতরা দেশের বাজারমূল্য অনুযায়ী আদায় করা যাবে।

বাংলাদেশে চাল প্রধান খাদ্য হওয়ায় অনেকেই চাল দিয়ে সরাসরি ফিতরা দিতে চান। কিন্তু হাদিসে সরাসরি চালের কথা উল্লেখ নেই। নবী করিম (সা.) গম, যব, খেজুর, কিশমিশ ও পনির—এই পাঁচটি দ্রব্যের কথা উল্লেখ করেছেন। যব, খেজুর, কিশমিশ বা পনির দিয়ে এক ‘সা’ এবং গম দিয়ে আধা ‘সা’ ফিতরা আদায় করতে হয়। কেউ যদি চাল দিয়ে ফিতরা দিতে চান, তাহলে এই দ্রব্যগুলোর যেকোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ চাল দিতে হবে।

অনেকেই মনে করেন খাদ্যদ্রব্য ছাড়া টাকা দিয়ে ফিতরা দেওয়া জায়েজ নয়। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের আমল থেকে জানা যায় যে খাদ্যদ্রব্যের সমমূল্যের অর্থ দিয়েও ফিতরা আদায় করা বৈধ। বর্তমান সময়ে দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণে নগদ অর্থ বেশি কার্যকর হওয়ায় অনেক ফকিহ টাকা দিয়ে ফিতরা দেওয়াকে উত্তম বলেছেন।

আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে সবাই শুধু গমের সর্বনিম্ন হার অনুযায়ী ফিতরা আদায় করবেন। অথচ যার সামর্থ্য বেশি, তার উচিত খেজুর, কিশমিশ বা পনিরের মূল্য অনুযায়ী ফিতরা দেওয়া। নিজের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম দ্রব্যের হিসাব ধরে ফিতরা দেওয়া তাকওয়ার পরিচায়ক।

অনেকে মনে করেন যার ওপর জাকাত ফরজ নয়, তার ওপর ফিতরাও নেই। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। জাকাত নির্দিষ্ট সম্পদের ওপর ফরজ হলেও সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের ওপর। ঈদের দিন সকালে যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে।

সদকাতুল ফিতর আদায়ের উত্তম সময় হলো ঈদের দিন ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে। তবে রমজানের শেষ কয়েক দিনেও তা আদায় করা যায়, যাতে দরিদ্ররা ঈদের আগে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে। কেউ যদি ঈদের নামাজের আগে দিতে না পারেন, তাহলে পরে হলেও তা আদায় করতে হবে।

ফিতরা শুধু অভাবী মুসলমানদের দেওয়া যাবে। অভাবী আত্মীয়দের দেওয়া উত্তম, কারণ এতে সদকার সওয়াবের পাশাপাশি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াবও পাওয়া যায়। তবে পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ফিতরা দিতে পারবেন না।

বর্তমান সময়ে অনেকেই বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে ফিতরা পাঠিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে ‘ক্যাশ আউট’ চার্জ দাতাকেই বহন করতে হবে, কারণ ফিতরার পুরো টাকা দরিদ্র ব্যক্তির হাতে পৌঁছানো শর্ত। একইভাবে খাদ্যদ্রব্য পাঠাতে পরিবহন খরচও দাতার নিজস্ব অর্থ থেকে দিতে হবে।

সদকাতুল ফিতর আমাদের ইবাদতের ত্রুটি মোচন করে এবং সমাজের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সঠিক মাসআলা জেনে বিশুদ্ধ নিয়তে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম মানের দ্রব্যমূল্য হিসাব করে এই ওয়াজিব ইবাদত আদায় করা।

আলোকিত গৌড়/আ

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর